বাংলাদেশে বাড়ছে তালাকের সংখ্যা, শঙ্কায় দেশের ভবিষ্যৎ!

দেশে বাড়ছে তালাকের সংখ্যা, শঙ্কায় দেশের ভবিষ্যৎ

যুগান্ত বাংলা বার্তা ডেস্ক:-

দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ অধিক হারে বাড়ছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং দাম্পত্যজীবনে বনিবনার অভাব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন চরমভাবে বিরোধ দেখা দেয়, মিলেমিশে শান্তিপূর্ণ ও জীবনযাপন যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় তখন মধুর সম্পর্ক তালাকের মাধ্যমে ছিন্ন করা হয়। ন্যায়সঙ্গত কারণে তালাক ইসলামে বৈধ। তবে এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট বৈধ কাজ। কিন্তু শিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারে তালাকের ঘটনা ঘটছে অহরহ। 

আর সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোতে তালাক এখন সাধারণ ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতোগুলো তালাকের ঘটনা ঘটছে তার কারণগুলো প্রায় একই। এতে বেশির ভাগই আবেদন করছে নারীরা। যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মাদকাসক্তি, স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, পুরুষত্বহীনতাসহ বিভিন্ন কারণ। 
অন্যদিকে বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, স্বামীর অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, সন্তান না হওয়ায় স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেন স্বামীরা। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাকের নোটিশ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তালাকের আবেদন নথিভুক্ত হয়। তারপর সেখান থেকে তালাকের আবেদন স্বামী এবং স্ত্রী সিটি কর্পোরেশনের কোন অঞ্চলে বাস করেন, সেই অনুযায়ী ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। পরে আবেদনকারী ও বিবাদী উভয়পক্ষকেই আপসের নোটিশ পাঠান সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট)। দুই পক্ষের মধ্যে আপস না হলে সিটি কর্পোরেশনের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। আবেদনের ৯০ দিনের মধ্যে কোনো পক্ষ আপস বা প্রত্যাহার আবেদন না করলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। 
বিবিএস বলছে, তারা তালাক হওয়া মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপ করেছে। ফলে এই জরিপের মাধ্যমেই আসল কারণ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, তালাকের বড় কারণ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। জরিপে উত্তরদাতাদের প্রায় ২৩ শতাংশ এই কারণ দেখিয়েছেন। এরপর রয়েছে দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতা, যা ২২ শতাংশ। ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে অসামর্থ্য অথবা অস্বীকৃতি, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন, যৌন অক্ষমতা বা অনীহা ইত্যাদিও রয়েছে তালাকের কারণের তালিকায়। ২০২৩ সালে তালাকের হার ছিল প্রতি ১০ হাজারে ১১টি। ২০২০ ও ২০২১ সালে গ্রাম এলাকায় তালাকের সংখ্যা ছিল প্রতি ১০ হাজারে যথাক্রমে ৯টি ও ৮টি। একই সময়ে শহরে ছিল ৭টি ও ৮টি। ২০২২ সালে অবশ্য গ্রাম এলাকায় তালাকের হার আরও বেশি প্রতি ১০ হাজারে ১৫টি। এ সময়ে শহরে যা ছিল ১০টি। বিয়ে করা মানুষের অধিকার, তবে সেটি হলো ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর হলে এবং মেয়েদের ১৮ বছর। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে দেশে বাল্যবিবাহের অবস্থার উন্নতি না হয়ে অবনতি হয়েছে। প্রতি হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে বিয়ের সংখ্যাকে স্থূল বিয়ের হার বলা হয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশে স্থূল বিয়ের হার এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ (প্রতি হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ১৮.১) লক্ষ করা গেছে। পল্লি অঞ্চলে স্থূল বিয়ের হার (১৯.৫) শহরাঞ্চলের (১৩.৮) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। 

বিভাগীয় পর্যায়ের স্থূল বিয়ের হার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগে এর হার সর্বোচ্চ; প্রতি হাজারের বিপরীতে ২০.৬১। আর ঢাকা বিভাগে স্থূল বিয়ের হার সবচেয়ে কম, ১৫.৬২। 

 নাম প্রকাশ না করে এক নারী জানান, তার ২ বছরের এক কন্যা সন্তান রয়েছে। তার স্বামীর সাথে অন্য এক নারীর সাথে অবৈধ পরকীয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বার বার নিষেধ করার পরও কিছুতেই তার স্বামী ফিরেনি বরং তাকে বিভিন্নভাবে শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন করা হত। ফলে এক পর্যায়ে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। 

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে সবচেয়ে বেশি তালাক হয়েছে ঢাকা বিভাগে, কম ময়মনসিংহ বিভাগে। দাম্পত্যজীবন পালনে অক্ষমতায় তালাক বেশি বরিশালে, কম সিলেটে। ভরণপোষণ দিতে অসামর্থ্যতার কারণে তালাক বেশি রাজশাহীতে, কম চট্টগ্রামে। পারিবারিক চাপে তালাক বেশি ময়মনসিংহে, কম ঢাকায়। নির্যাতনের কারণেও তালাক বেশি হয়েছে ময়মনসিংহে, কম রাজশাহীতে। যৌন অক্ষমতা অথবা অনীহার কারণে রংপুরে তালাক বেশি হয়েছে। বরিশালে এ ক্ষেত্রে হার শূন্য। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তালাকের ঘটনা বেশি ঘটছে সিলেটে। 
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে তালাকের ঘটনা। এতে বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। ভেঙে যাচ্ছে সংসার ও পারিবারিক বন্ধন। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন। সমাজ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আগের চেয়ে নারীরা স্বাবলম্বী, স্বাধীন মনোভাব, নারীদের উচ্চ বেতনে চাকরি, আর্থিকভাবে স্বচ্ছলতা, নির্যাতন সহ্য না করা এবং প্রতিবাদ করার মনোভাবের কারণে তালাকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব দেখা দিতে পারে। কোন কোন সংসারে সন্তান থাকা অবস্থায়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা ঘটে। ওই সংসারের সন্তানটি শিশু অবস্থায়ই অভিভাবক শূন্য হয়ে পরে। এতে করে সে প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠবে। পরবর্তীতে অপরাধী হয়ে সমাজে বেড়ে উঠার আশঙ্কা থেকে যায়।

Comments

Popular posts from this blog

নারায়ণগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় সাংবাদিক বিপ্লব গুরুতর আহত, সুযোগ বুঝে সর্বস্ব লুটলো চালক

জনসচেতনতা বৃদ্ধি করলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ও এর ভয়াবহতা দূর করা সম্ভব : সাখাওয়াত হোসেন খান

গণতন্ত্র হুমকির মুখে? গণতন্ত্রে বিশ্বাস না করা শক্তির উত্থান হচ্ছে- মির্জা ফখরুলের সতর্ক বার্তা